ট্রেডিং সাইকোলজি
একই টেকনিক্যাল এনালাইসিস শিখে ট্রেড করতে গিয়ে কেউ মুলধন হারিয়ে ফেলে আবার কেউ মুলধন অনেকগুনে বাড়িয়ে ফেলে। ফলাফলের এই তারতম্যের মুলে আছে ট্রেডিং সাইকোলজি। কাজেই এটা খুব গুরুত্ব সহকারে বোঝা দরকার।
সাইকোলজি হলো মানুষের মন ও আচরণের অনুধ্যান। খুব সহজে বলতে গেলে মানুষের মনের যে বিষয়গুলো তার ট্রেডিং এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অর্থাৎ ট্রেডিং আচরণে প্রভাব ফেলে তার অনুধ্যানই হলো ট্রেডিং সাইকোলজি।
একজন ট্রেডারের যে সকল মানসিক বিষয়গুলো তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে বেশী প্রভাব ফেলে সেই বিষয়গুলো হলো-
১। আবেগঃ কোন একটি ঘটনার ফলে আমরা দেহ মনে যে উত্তেজনা অনুভব করি তাই আবেগ। আবেগের বহিঃপ্রকাশ হলো হাসি, কান্না, দুঃখ, রাগ ইত্যাদি। বেশী আবেগ মানুষের বিচার বিবেচনা ক্ষমতা কমিয়ে ফেলে। এধরণের মানসিক অবস্থায় ট্রেড করলে সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে তাই আবেগীয় পরিস্থিতিতে ট্রেড করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
২। লোভঃ লোভ হলো খুব বেশী পাওয়ার আকাংখা। এই বৈশিষ্ট থাকলে মানুষের সাধারণ বিচার বিবেচনা ক্ষমতা কমে যায় এবং কাংক্ষিত বস্তু পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল করে। কাজেই লোভের বশবর্তী হয়ে ট্রেড করা যাবে না।
৩। ভয়ঃ ভয় হলো কোন কিছু হারানোর শংকা। এই শংকা একজন ট্রেডারের মধ্যে সুযোগ হারানোর শংকা তৈরী করে ফলে সে প্রিম্যাচিউর ট্রেড করে এবং ক্ষতির মধ্যে পড়ে। ট্রেডারের এই ধরণের ট্রেডকে ফোমো ট্রেডিং বলে।
৪। ক্ষোভঃ কোন একটি ক্ষতি থেকে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম হয়। ক্ষোভ মানুষের মধ্যে রাগ/জেদ তৈরী করে যা তার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় ফলে সে ট্রেডিং এ ভুল করতে পারে। এজন্য ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে ট্রেড করা যাবে না।
৫। হতাশাঃ কোন বড় দুঃখ বা হারানোর বেদনা মানুষকে হতাশ করে তোলে। মানুষ হতাশ থাকলে তার মস্তিস্কের লজিক্যাল ইউনিটগুলো কম সক্রিয় থাকে। কাজেই হতাশা থাকলে ট্রেডিং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হতে পারে। কাজেই হতাশা ঝেড়ে ফেলে ট্রেড করাই ভাল।
৬। ঝুকি গ্রহণের ক্ষমতাঃ এক এক মানুষের ঝুকি গ্রহণের ক্ষমতা এক এক রকম। যারা ঝুকি গ্রহণে অভ্যস্ত নয় তারা ভয় পার এবং প্রিম্যাচিউর ট্রেড বেশী করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ট্রেডিং একটি ঝুকিপূর্ণ কাজ। সুতরং ট্রেড করতে হলে ঝুকি গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
৭। ধোর্যঃ ধৈর্য কি তা বলার দরকার নাই তবে ট্রেডিং এ যে ধৈর্যের প্রয়োজন অনেক বেশী সেটা বলতেই হবে। ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে ট্রেডিং এ ভুল হয় কাজেই ট্রেডিং যদি করতেই হয় তবে ধৈর্য অবশ্যই বাড়াতে হবে।
৮। কনফিডেন্সের অভাবঃ কনফিডেন্সের অভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হয় ব সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয় ফলে ভুল টাইমিং বা গুরুত্বপূর্ণ ট্রেড মিস হয়। কাজেই, ট্রেডিং এ কনফিডেন্স বাড়াতে হবে।
৯। ওভার কনফিডেন্সঃ ওভার কনফিডেন্স সবক্ষেত্রেই ক্ষতির কারণ হয়। তেমনি ট্রেডিং এ ওভার কনফিডেন্সের কারণে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ভুল হতে পারে। এজন্য আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।
১০। দুর্বল এক্সিকিউশন পাওয়ারঃ উপরের সবকিছুই ঠিক আছে সিদ্ধান্তও নিলাম ঠিকঠাক কিন্তু এক্সিকিউশন করার সময় ঢিলেমি করলাম তাহলে উপযুক্ত ফল নাও আসতে পারে।
১১। ট্রেডিং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার ক্ষমতাঃ ভুল/সফলতা থেকে মানুষ সবসময় শেখে। ট্রেডারকেও তার ভুল ও সফলতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। ভুল থেকে শিখলে ভুল ও লস কমবে আর সফলতা থেকে শিখলে সফলতা ও মুনাফা বাড়বে। এজন্য, ট্রেডিং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া খুব জরুরী।
১২। কবিরাজে বিশ্বাসঃ এই আধুনিক যুগেও অনেকেই এখনো চিকিৎসার জন্য ওঝা বা কবিরাজের কাছে যায়। অসুখ সারা দুরের কথা সর্বশান্ত হয়ে ফিরে আসে। ট্রেডিংএ অনেকেই তথাকথিত ওঝা/কবিরাজের কাছে যায়। ওঝা/কবিরাজের কাছে ঔষধ আনতে গিয়ে যারা ওঝা/কবিরাজের হেলপার হয়ে যায় তারা কিছুটা লাভবান হলেও যারা শুধুই চিকিৎসা করানোর জন্য যায় তার ওঝা/কবিরাজের কাছেও ঠকে আবার তার হেলপারের কাছেও ঠকে। কাজেই সাবধান! ওঝা/কবিরাজের কাছ থেকে দূরে থাকুন।
সিস্টেমেটিক ট্রেডিং
পদ্ধতিগত ট্রেডিং হল কোন একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ট্রেড করা। সেটা টেকনিক্যাল বা ফান্ডামেন্টাল হতে পারে। এখানে লাভ লস যাই হোক না কেন, পদ্ধতির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই, প্রয়োজনে পদ্ধতির সংশোধন করা হয়। উদাহরণ হিসাবে টার্টল ট্রেডিং এর কথা বলা যায়।
নিউজ ট্রেডিং
নিউজ ট্রেডিং হল কোন খবরের ভিত্তিতে ট্রেড করা। খবরের উৎস পত্রিকা, সোশাল মিডিয়া বা কোন ব্যাক্তি হতে পারে। এই খবরের ভিত্তি থাকতেও পারে আবার নাও থাকতে পারে। খবরের ভিত্তি না থাকলে সেটাকে আমরা গুজব বলি। আবার খবরের তুলনায় যখনে ট্রেডিং এ বেশী রিএকশন দেখা যায় তখন সেটাকে প্যানিক বলি।
ফোমো ট্রেডিং
ফোমো হল ইংরেজি টার্ম। এর অর্থ হলো ফিয়ার অব মিসিং আউট। বাংলায় বলে সুযোগ হারানোর ভয়। অর্থাৎ কোন একটা ট্রেড মিস করার ভয়। এই ভয় থেকে মানুষ একটা সেটআপ রেডি হওয়ার আগেই ট্রেড করে অথবা বেস কিছু প্রাইস বাড়ার পর ট্রেড করে, ট্রেড মিস করতে চায় না, আর এটাই হলো ফোমো ট্রেডিং।
ট্রেডিং মিসটেকস
ট্রেডিং মিসটেকস বলতে ট্রেডিংএ সধারণ ভুলগুলোকে বোঝানো হয়। যেমন-
- ট্রেডিং এর জ্ঞান ছাড়া ট্রেড করা
- ট্রেডিং প্ল্যান না থাকা
- হোম ওয়ার্ক ছাড়াই হুট হাট ট্রেড করা
- ফোমো ট্রেডিং করা
- নিউজ ট্রেডিং করা
- সাপোর্ট জোনে বিক্রি করা
- রেজিস্টেন্স জোনে কেনা
- ট্রেন্ড না বুঝে ট্রেড করা
- ইন্ডেক্স এর বিপরীতে ট্রেড করা
- শুরুতে খুব বেশী বিনিয়োগ করা
- লট সাইজ ঠিক না থাকা
- আবেগের বশে ট্রেড করা
- ওনেক বেশী ঝুকি নেওয়া
- যথা সময়ে এসএল না নেওয়া
- ইত্যাদি ইত্যাদি
ট্রেডিং ডিসিপ্লিন
ট্রেডিং ডিসিপ্লিন হলো ট্রেডিং এর শৃংখলা বা নিয়মাবর্তীতা। এটা ট্রেডিং এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রের শৃংখলা/নিয়মাবর্তীতাকে বোঝায়। এটা বোঝায় যে, একজন ট্রেডারের এন্ট্রি, এক্সিট, এসএল, টিপি, ট্রেইলিং সবকিছু থাকতে হবে নিয়মের মধ্যে এবং শুধু নিয়ম থাকলে হবে না নিয়ম মেনেও চলতে হবে। এটা ট্রেডিং এ ভাল অভ্যাস গড়তে সহায়তা করে এবং সফলতা বয়ে আনে।
ট্রেডিং চেকলিসস্ট
চেকলিস্ট হলো কোন কাজ করার জন্য পূর্বনির্ধারিত তালিকা। ট্রেডিং চেকলিস্ট হলো ট্রেড করার জন্য পূর্বনির্ধারিত তালিকা। এই তালিকা মুলত শর্তের তালিকা। যেমন-
১) কোন কোন শর্ত পূরণ করলে শেয়ার কিনব [লং]
২) কোন কোন শর্তে শেয়ার বিক্রি করব [শর্ট]
৩) কোন কোন শর্তে এসএল নিব
৪) কোন কোন শর্তে টিপি নিব ইত্যাদি ইত্যাদি।
এই পর্বে ট্রেডিং সাইকোলজি নিয়ে ভুমিকা করা হলো। মানসিক বিষয়গুলো কিভাবে নিয়ন্ত্রিত রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা যায় তার উপায় সমুহ জানতে লেলেভ-৩ পড়তে পারেন।