বন্ধু্রা মিলে একদিন আড্ডা দিচ্ছিলাম। এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করল আমাদের জীবনের লক্ষ্য কি?
উত্তরে, কেউ বলল ১০ এ ৮, কেউ বলল ঝাল মুড়ির ঠোঙ্গা এরকম কত মজার উক্তি। তাদের ব্যখ্যাগুলো এরকম ছিল, জীবনের লক্ষ্য রচনা ছিল পরীক্ষায় লিখে ১০ এ ৮ পেয়েছি, আর কি? কেউ বলল তার পরীক্ষার সেই খাতা দিয়ে নাকি ঝাল মুড়ির ঠোঙ্গা বানানো হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি।
উপরের কথাগুলো বললাম আমাদের জীবনের লক্ষ্য এর অবস্থা বোঝানোর জন্য। আমরা আসলে পড়ি/মুখস্ত করি পরীক্ষা আর সার্টিফিকেটের জন্য, বিষয়বস্তু বুঝি না এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করি না তাই আমদের ভবিষ্যত গুলো ফেলে দোওয়া মুড়ির ঠোঙ্গার মত ময়লার স্তূপে হাওয়ায় ওড়ে।
একজন রেলস্টেশনে গেল, কাউন্টারে বলল টিকিট দাও, কাউন্টার মাস্টার বলল কোথাকার, লোকটি বলল- যে কোন জায়গার। ঘটনা যদি এই হয় তবে কাউন্টার মাস্টার হয় লোকটিকে টিকেট দেবে না আর যদি দেয় তবে সেটা তার কাজে আসবে না। লোকটি কখন কোথায় পৌঁছাতে চায় তা যদি নির্দিষ্ট থাকে এবং যদি ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছাতে চায় তবে সে কোন জায়গায় যাবে, কয়টার কোন ট্রেনে যাবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে হবে। তবেই সে তার লক্ষ্যেস্থলে পৌঁছাতে পারবে।
সামান্য এইটুকু ভ্রমণের জন্য যদি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে থাকতে হয় তবে এত বড় জীবনের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকা উচিত অন্যথায় আপনি যা চান তা না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশী।
বাস্তবতা হলো, পাহাড়ে চড়ার জন্য সবচেয়ে জরুরী হলো পাহাড়। একটি সঠিক ঠিকানা ছাড়া একটি চিঠি / মেইল কাংখিত ডেস্টিনেশনে পৌঁছায় না, মেইল বাউন্স হয়। একটি জাহাজ/বিমান চালনার জন্য যদি ডাইরেকশন মিটার না থাকে তবে সেটা লক্ষ্যে না পৌঁছে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
আমাদের সম্ভাবনা কম নেই, যা কম আছে তা হলো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকায় আমাদের সফলতা আসে না।
১৯৭৯ সালে হার্ভাড এমবিএ শিক্ষার্থীদের উপর এক গবেষনায় দেখা যায় যে, ৮৪% লক্ষ্যই নির্ধারণ করে না, ১৩% মনে মনে লক্ষ্য নির্ধারণ করে কিন্তু লিখে রাখে না, মাত্র ৩% তাদের লক্ষ্য কাগজে লিখে রাখে।
১০ বছর পর ১৯৮৯ সালে একই ব্যক্তিদের উপর সমীক্ষা করে দেখা যায় যে, যে ১৩% মনে মনে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল তার বাঁকি ৮৪% এর চেয়ে ২গুন বেশি আয় করছে, আর যে ৩% তাদের লক্ষ্য কাগজে লিখে রেখেছিল তারা সবার চেয়ে অনেক বেশি আয় করছিল।
ধরুন, একজন তার লক্ষ্য নির্ধারণ করেত চায়, তবে তার লক্ষ্য কেমন হওয়া উচিত? এক কথায় এর উত্তর হলো- "স্মার্ট"। স্মার্ট লক্ষ্য কি?
এস= স্পেসিফিক [সুনির্দিষ্ট]
এম= মেজারেবল [পরিমাপযোগ্য]
এ= এচিভএবল [অর্জনযোগ্য]
আর= রিলেভেন্ট [যৌক্তিক]
টি= টাইম-বাউন্ড [সময় আবদ্ধ]
স্পেসিফিক [সুনির্দিষ্ট]- একজন কি করতে চায় বা পেতে চায় বা হতে চায় তা সুনির্দিষ্ট হতে হবে। যেমন একজন প্রতি মাসে ১ লক্ষ টাকা আয় করতে চায়। লক্ষ্য নিজের কাছে ক্লিয়ার হতে হব, লক্ষ্য অর্জনের জন্য নিজের করনীয় জানা থাকতে হবে এবং সে লক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে ও অবিচল থাকতে হবে। লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট ও ক্লিয়ার হলে শুরুটা ভাল হয়।
মেজারেবল [পরিমাপযোগ্য]- যা করতে বা হতে চায় তা অবশ্যই পরিমাপযোগ্য হতে হবে। যেমন একজন প্রতি মাসে ১ টা করে ১২ মাসে মোট ১২ টি বই পড়তে চায়। এতে নিজের অগ্রগতি পরিমাপ করা যায়, উৎসাহ বাড়ে, আরো উন্নতি করার সুযোগ নির্ণয় করা যায় এবং লক্ষ্য অর্জন সহজ হয়।
এচিভএবল [অর্জনযোগ্য]- যা করতে বা হতে চায় তা অবশ্যই অর্জনযোগ্য হতে হবে। কেউ যদি লক্ষ্য ঠিক করে যে সে চাঁদে যেতে চায় তবে এটা অর্জন যোগ্য নয়। শুধু ডায়লগ দিলেই লক্ষ্য অর্জিত হবে না, লক্ষ্যটা অবশ্যই কাজের মাধ্যমে অর্জনযোগ্য হতে হবে।
রিলেভেন্ট [যৌক্তিক]- যা করতে বা হতে চায় তা অবশ্যই যৌক্তিক হতে হবে।কেউ যদি লক্ষ্য ঠিক করে যে সে অমর হতে চায় তবে এটা যৌক্তিক নয়। কাজেই এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে যা যৌক্তিক। এজন্য, লক্ষ্য কেন নির্ধারণ করছি সে প্রশ্নের উত্তর থাকতে হবে।
টাইম-বাউন্ড [সময় আবদ্ধ]- যা করতে বা হতে চায় তা অবশ্যই টাইম বাউন্ড হতে হবে। যেমন সে এই বছর ৩০সে ডিসেম্বরের মধ্যে গাড়ী কিনতে চায়। এমন হওয়া যাবে না যে, আমি একদিন গাড়ী চায়। মনে রাখবেন সময় যদি না নির্ধারণ করেন তবে লক্ষ্য পুরণ কখনো নাও হতে পারে।
লক্ষ্য ৩ তিন রকম হতে পারে-
১) শর্ট টার্মঃ এ বছর কি করতে চায়, কি পেতে বা হতে চায়। এ লক্ষ্য গুলো ছোট ছোট হয়। মানুষ ছোট ছোট শখ বা ইচ্ছা পূরণের জন্য এধরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করে যেমন সে এবছর ডিসেম্বরেরে মধ্যে কক্সবাজারে বেড়াতে যেতে চায়।
২) মিড টার্মঃ ২-৫ বছরে কি করতে চায়, কি পেতে বা হতে চায়। এ লক্ষ্য গুলো তুলনামূলক বড় হয় ও সময় বেশি প্রয়োজন হয়। ২০২৫ সালের মধ্যে সে তিনগুন আয় করতে চায় ।
২) লং টার্মঃ ৫-১০-২০ বছরে কি করতে চায়, কি পেতে বা হতে চায়। এ লক্ষ্য গুলো তুলনামূলক অনেক বড় ও সময় সাপেক্ষ্য হয়। ২০৩৫ সালের মধ্যে সে তার ফ্ল্যাটের ঋণ সম্পূর্ণ পরিশোধ করতে চায়।
এখন প্রশ্ন হতে পারে যে, লক্ষ্য কি মনে মনে থাকবে নাকি লিখিত? এটা কি গোপন থাকবে নাকি ওপেন থাকবে?
উত্তর হলো, হ্যাঁ, লক্ষ্য অবশ্যই লিখিত হতে হবে এবং ওপেন হতে হবে। লিখিত হলে এটা ভুলবেন না এবং ওপেন হলে অন্যরা যারা আপনার লক্ষ্য জেনেছে তার আপনাকে ফ্রি রিমাইন্ডার দিবে এবং আপনি তখন আরো ফোকাসড হবেন।
আপনার বিনিয়োগ নিয়েও আপনার স্মার্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত।